Friday, 1 August 2014

শিলা ও খনিজ পরিচয়


প্রথম পরিচ্ছেদঃ উপস্থাপনা
পৃথিবীর উপরের ভাগ বা ত্বক যে শক্ত অজৈব আবরণে ঢাকা আছে তা কোথাও পাথর আবার কোথাও বা পলির অশিলীভূত স্তর দিয়ে ঢাকাপাহাড়ের বা উচ্চভূমির পাথর ভেঙ্গে টুকরো কিম্বা ক্ষয়িত হয়ে জল, বায়ু, নদী, হিমবাহ ইত্যাদি বাহিত হয়ে জমা হলে পলল বা সেডিমেন্ট গঠিত হয় পাথর এবং পলল দুএরই মূল উপাদান খনিজ আমরা যদি কেউ ভূতাত্ত্বিক বা ভূবৈজ্ঞানিক হতে চাই, অথবা শুধুই যদি খনিজ বা পাথর সংগ্রাহক হতে চাই তবে খুব সাধারণ কিছু ভূতাত্বিক জ্ঞান বা ধারণা থাকা ভাল বিভিন্ন ধরণের পাথর সংগ্রহ করা বা যে সমস্ত খনিজ দিয়ে পাথর গঠিত হয় সেগুলোকে সংগ্রহ করা খুব আকর্ষণীয় একটা হবি একটা পাথরের টুকরোর কাছ থেকে আমরা এই পৃথিবীর ভূতাত্বিক ইতিহাসের অনেক চিত্তাকর্ষক কাহিনী জানতে পারি

খনিজ সংগ্রহের ব্যাপারে আমাদের প্রাথমিক কাজ হল কোথায় পাথর বা খনিজ আমরা খুঁজব তা জানা পাহাড়, মালভূমি, পাহাড়ি নদী, সমুদ্রতট এই সমস্ত জায়গাতে নানা ধরণের পাথর ও খনিজ পাওয়া যেতে পারে কিন্তু এ সম্বন্ধে কিছুটা প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে আমাদের খোঁজার কাজ অনেক সহজ হয় প্রথমে কারা এই পাথর বা খনিজ সম্বন্ধে কৌতূহলী সেটা একবার দেখা যাক সাধারণত: বয়স্ক লোকজন খুব কমই পাথর সংগ্রহের ব্যাপারে উৎসাহী এনারা স্বভাবতই শুধু ঘর সাজানো বা কোনও জায়গার নিদর্শন হিসাবে পাথর বা খনিজ সংগ্রহ করেন কিন্তু  ছোটরা বেশীরভাগক্ষেত্রেই পাথরের রং কিম্বা আকার দেখে আকৃষ্ট হয়ে কোনও বাছবিচার না করে যেখানে যেরকম পাথর পায় তা সেখান থেকেই কুড়িয়ে নেয়

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : খনিজ সংগ্রহের প্রস্তুতি 
গত সংখ্যায় আমরা পাথর এবং খনিজ চেনার বিষয়ে কিছু আলোচনা করেছিএখন আমরা খনিজ সংগ্রহ এবং চেনার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটা সাধারণ জিনিষপত্রর দিকে দৃষ্টি দেবএকজন খনিজ সংগ্রাহকের প্রথম দরকার একটা হাতুড়ি এবং একটা আতসকাঁচ বা পকেটলেন্স হাতুড়ির প্রয়োজন পাথরভাঙ্গা এবং ধারটারগুলো ছেঁটে ফেলার জন্য হাতুড়িটা হবে একটু বিশেষ ধরণের একটা মাথা ভোঁতা এবং আরেকটা মাথাচ্যাপ্টা কুড়ুলের মত নরম পাথর ভাঙ্গা এবং জীবাশ্ম সংগ্রহের সময় অনেক সময় ছেনির মত ছুঁচলো মাথা হাতুড়িও ব্যবহার করা হয় এইসব হাতুড়ি হার্ডওয়্যারের দোকান বা ভূবিজ্ঞানীদের যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীর কাছে পাওয়া যাবে

পকেটলেন্স কাজে লাগবে মিনারেল বা খনিজ চেনার জন্য এটা সাধারণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বা অপটিক্যাল স্টোর্স এ পাওয়া যাবে আরও কিছুসাধারণ প্রয়োজনীয় বস্তুর মধ্যে, সংগৃহীত পাথর মুড়ে রাখবার কাগজ, ছোট কাপড়ের থলে কিম্বা প্লাস্টিক প্যাকেট, অল্প কিছু খাবার, একটা পকেটছুরিএকটা নোটবই এবং সব কিছু বহন করার জন্য একটা হ্যাভারস্যাক লাগবে পকেটছুরি অনেক কাজে লাগে, বিশেষকরে খনিজের কঠোরতা ধারণা করার জন্য এবং নোট বই লাগবে সংগৃহীত পাথর, খনিজ সম্বন্ধে সংগৃহীত স্থানেই প্রয়োজনীয় তথ্যাদি লিখে রাখবার জন্যঅনেক সময় পাথর এবং খনিজ সংগ্রহ অভিযানে আরও কিছু জিনিষের প্রয়োজন হতে পারে যেমন শক্ত, বড় পাথর ভাঙ্গার জন্য বড় হাতুড়ি, চুনাপাথর ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড প্রভৃতি সংগ্রাহক প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের একটা তালিকা প্রস্তুত করে অভিযান অনুযায়ী দরকারি জিনিষ বেছে নিয়ে যেতে পারেন এবার আমরা চোখ দেব খনিজ সংগ্রহের সময় আমাদের কী করা দরকার তার দিকে
) সংগৃহীত নমুনার গায়ে লেবেল লাগিয়ে তৎক্ষণাৎ নোট বইয়ে কোথা থেকে তা পাওয়া গেল লিখে রাখা পাথর পরেও চেনা যেতে পারে কিন্তু লেবেলিং এবং পাওয়ার স্থান না লিখলে পরে সব গুলিয়ে যেতে পারে
) সংগৃহীত পাথরকটা নির্দিষ্ট আকারে, যাতে তার বৈশিষ্ট্যগুলো ভালোভাবে দেখা যায় সেইভাবে কাটছাট করে নেওয়া ভালো ”× ”× ভালোসাইজএছাড়া ৩”×”×বা ৩”×”× এই সমস্ত সাইজেও নমুনা সংগ্রহ করা যেতে পারে
) কারো ব্যক্তিগত জমি জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করলে আগাম অনুমতি নেওয়া ভালো
) নমুনা সংগ্রহর সময় যথেষ্ট সাবধান হওয়া দরকার একজন সঙ্গী থাকলে ভাল হয় সম্ভব হলে একটা ফার্স্ট এইড কিট রাখতে হবে পাথর ভাঙ্গার সময় শরীর ঢাকা জামাকাপড়, শক্ত জুতো, মাথায় মোটা টুপি এবং চোখ প্লাস্টিক চশমা দিয়ে ঢাকলে ভালখাড়া পাহাড়, ঝুলন্ত পাথর কিম্বা খনির দেওয়াল ভেঙ্গে নমুনা সংগ্রহ উচিত নয়
) কোনও জাতীয় উদ্যান, মনুমেন্ট বা রাজ্য উদ্যান থেকে নমুনা সংগ্রহ ঠিক নয় একই ধরণের পাথর উদ্যানের বাইরেও পাওয়া যেতে  পারে
) অনেক বড় বাড়ী, কবরস্থান ইত্যাদি জায়গায় নানা ধরনের পালিশ করা বড় পাথর দেখা যায় এইসব পাথর বিভিন্ন দূর দেশ থেকে আনা হয় এগুলো ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলে এদের খনিজ বৈশিষ্ট্য জানা যাবে
) কোন খনিজ পত্রিকা বা খনিজ সংগ্রাহকদের ক্লাবএর সদস্য হতে পারলে ভাল হয় অনেক সময় এখানে পাথর নিয়ে বিভিন্ন আলোচনাও হয়
) বিভিন্ন রাজ্য কিম্বা দেশের থেকে সংগৃহীত পাথরের আলাদা কোন বৈজ্ঞানিক বিশেষত্ব নেই পাথরের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যাওয়া পৃথিবীর জন্মবৃত্তান্তের সাথে জড়িত রাজনৈতিক ভাবে বিভাজিত নয়

সংরক্ষণ ও প্রদর্শন
যখন আপনার বেশ কিছু নমুনা সংগৃহিত হয়েছে, তার পরিচিতি এবং তথ্যাদি সংকলিত হয়েছে তখন দেখা উচিত কত ভালভাবে তা সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন করা যায় অনেকে কার্ড বোর্ডের বাক্সে নমুনা রেখে ট্রেতে সাজিয়ে রাখে অনেকে নিজেই পাথর এবং খনিজ এর সাইজ অনুযায়ী কার্ড বোর্ডের বাক্স এবং ট্রে বা ড্রয়ার বানায় তবে দোকান থেকে কিনে বা মিস্ত্রী ডেকে ও নিজের পছন্দমত এসব বানিয়ে নেওয়া যায়


তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ খনিজ চেনার বৈশিষ্ট্য সমূহ (১)
আগের পরিচ্ছেদে আমরা একজন খনিজ সংগ্রাহকের বিশেষ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন এবং পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা খনিজের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব যা খনিজকে ঠিকভাবে চিনতে সাহায্য করবে।

যেহেতু খনিজই শিলা গঠন করে সেই জন্য শিলা চিনতে গেলে আগে তার খনিজ চেনা বিশেষ প্রয়োজন। খনিজের কঠোরতা, মৃদু হাইড্রোক্লোরিক অম্লের সাথে তার বিক্রিয়া এবং খনিজের খাঁজ বা ক্লিভেজ এই তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য খনিজ চেনার বিশেষ সহায়কঅন্য বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন রং, ঔজ্জ্বল্য বা দ্যুতি, খনিজ গুড়োর রং বা স্ট্রিক্ এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব খনিজ চিনতে সাহায্য করে।

রঙ
কিছু খনিজ তাদের নির্দিষ্ট রঙ দ্বারা চেনা যায়কিন্তু অনেক সময় একই খনিজের অনেক রকম রঙ হয় বলে খনিজ চেনার জন্য একে প্রধান বৈশিষ্ট্য না বলে সহায়কের মর্যাদা দেওয়া ভালো। বিভিন্ন খনিজের মধ্যে আলোক কিভাবে প্রবেশ করবে তার ধরণ ও বৈশিষ্ট্য আলাদাখনিজের গঠন, মৌল উপাদান এবং আরও কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে খনিজকে স্বচ্ছ, অর্ধস্বচ্ছ, এবং অস্বচ্ছ বা ওপেক এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
রঙ যদিও খনিজ চেনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিষয়টা একটু জটিল। বিশেষজ্ঞরা খনিজ চেনার জন্য অনেক সময় রঙকে প্রাধান্য দেন, কারণ তারা সাধারণ খনিজের বিভিন্ন রঙ এর সাথে বহুল পরিচিত। নতুন সংগ্রাহকেরা খনিজের রঙ ভাল ভাবে পরখ করবে কিন্তু চেনার ব্যাপারে রঙ এর উপর পুরোপুরি নির্ভর না করা ভাল। এছাড়া রঙ পরীক্ষার সময় খনিজের পরিষ্কার অংশ ভাল আলোতে দেখা উচিত। ধাতব এবং ওপেক খনিজের ক্ষেত্রে রঙ বেশ নির্ভর যোগ্য। যেমন অ্যাজুরাইট খনিজের নীল রঙ বা পাইরাইট খনিজের হলুদ রঙ তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য।
স্বচ্ছ বা অস্বচ্ছ খনিজের রঙ সাধারণতঃ কিছু অশুদ্ধির উপস্থিতির কারণে ঘটে। শুদ্ধ কোয়ার্টজ বর্ণহীন কিম্বা সাদা। কিন্তু অশুদ্ধির কারণে কোয়ার্টজ নানা রঙএর হতে পারেপরীক্ষা করার সময় দেখা দরকার রঙ হাল্কা না গাঢ়, অন্য কোন সাধারণ জিনিষের রঙ এর সাথে মিল আছে কিনা, যেমন ইটের মত রঙ ইত্যাদি। অতি বেগুনী বা আল্ট্রাভায়োলেট আলো থাকলে তার তলায় খনিজের অন্য রং হয় কিনা দেখা যেতে পারে।

ঔজ্জ্বল্য বা দ্যুতি
খনিজ চেনার জন্য আরেকটি পরিমাপ হল তার দ্যুতিএকটি খনিজের পরিষ্কার তলে কতটা আলো প্রতিফলিত হয় এটা তার দ্যুতির মাপ। তিনটি প্রধান খনিজ দ্যুতিধাতব, কাঁচেরমত এবং অনুজ্জ্বল। ধাতব এবং কাঁচের মত- র মধ্যবর্তী ঔজ্জ্বল্যকে বলে দীপ্ত বা হিরকসম (অ্যাডামেন্টাইন), কাঁচেরমত এবং অনুজ্জ্বলর মধ্যবর্তী দ্যুতিকে বলে মোমতূল্য।
পাইরাইটের ধাতব দ্যুতি

দ্যুতির প্রকারভেদ
·         ধাতব চকচকে ধাতুর মত
·         অধাতব অন্য আরও নানা রকম খনিজ দ্যুতি
·         ভাঙ্গা কাচের মতচকচকে
·         মাটির মত অনুজ্জ্বল
·         মোম বা রজনের মত অল্প চকচকে
·         মুক্তোর মত বা জলে পেট্রোলিয়াম তেল পড়লে যেমন রামধনুর মত রং দেখা যায়
·         দীপ্ত বা হীরার মত ঝকঝকে
কাঠিন্য
খনিজের গায়ে আঁচড় কাটতে খনিজ যতটা প্রতিরোধ করে সেটাই তার কঠিনতার মাপ। ভঙ্গুরতার সাথে এটাকে গুলানো যাবেনা। হিরে যেমন অসম্ভব কঠিন এবং হাতুড়ির গায়ে আঁচড় কাটতে পারে কিন্তু হিরে হাতুড়ির আঘাতে ভেঙ্গেও যায়। আবার ট্যাল্ক এর মত নরম খনিজের উপর নখ দিয়েই দাগ কাটা যায় কিন্তু ট্যাল্ক দিয়ে মাথায় মারলে যথেষ্ট আঘাত লাগতে পারে।
মোহ্র কাঠিন্য পরিমাপ স্কেলে বিভিন্ন খনিজের কাঠিন্যর তফাৎ খনিজ চিনতে যথেষ্ট সাহায্য করলেও এর সাথে সাথে রঙ, ঔজ্জ্বল্য, ক্লিভেজ বা খাঁজ আছে কিনা ইত্যাদি অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোর সাহায্য নিয়েই একটি খনিজ ঠিক ভাবে চেনা যেতে পারে।

মোহ্র কাঠিন্য পরিমাপ স্কেল
1.    ট্যাল্ক(নরমতম)
2.    জিপসাম
3.    ক্যালসাইট
4.    ফ্লুওরাইট
5.    অ্যাপাটাইট
6.    ফেল্ডস্পার
7.    কোয়ার্টজ
8.    টোপাজ
9.    কোরান্ডাম
10.              ডায়মন্ড(কঠিনতম)
কোয়ার্টজ
টোপাজ

ফ্লুওরাইট




অ্যাপেটাইট
ফেল্ডস্পার
ডায়মন্ড বা হিরা
ক্যালসাইট

কোরান্ডাম
জিপসাম
ট্যাল্ক
বেশ কিছু সাধারণ জিনিষের কাঠিন্য মোহ্স্কেলে পরিমাপ যোগ্য। যেমন মানুষের নখ মোহ্স্কেল অনুযায়ী 2.5, তামার পয়সা বা পাত 3 এর একটু নীচে, লোহার ছুরি 5.5, কাঁচ 6, ভালো ইস্পাত 6.5 কৃত্রিম কোরান্ডাম গুঁড়ো লাগানো ঘষার কাগজ 9 গার্নেট গুঁড়ো লাগানো ঘষার কাগজ 7.5 ইত্যাদি

স্ট্রিক বা ঘষাদাগ
খনিজের গুড়োর রঙ কে স্ট্রিক বা ঘষাদাগ বলে। খনিজের রঙ এর থেকে খনিজ গুঁড়োর রঙ খনিজ চেনার জন্য অনেক বেশি নির্ভরযোগ্যস্ট্রিকপ্লেট বা কষ্টিপাথরের টুকরো বা সিরামিক টাইলস এর একটা ছোট টুকরো নিয়ে তার অমসৃণ বা রাফ তলটিতে খনিজটির একটি কোনা ঘষলে প্লেটের উপর যে দাগ পড়বে সেটাই খনিজের গুঁড়োর রঙএকটি খনিজ বিভিন্ন রঙ এ পাওয়া গেলেও তার গুঁড়োর রঙ এক এবং তা খনিজ চেনার জন্য অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। বেশিরভাগ খনিজের গুঁড়োর রঙ সাদা। তবে কিছু কিছু খনিজের গুঁড়োর রঙ তার একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে স্ট্রিক প্লেট এর কাঠিন্য মোহ্স্কেলে 7 এর বেশী হওয়া ভালো। খনিজের গুঁড়োর রঙ স্ট্রিকপ্লেট থেকে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে সহজে মুছে ফেলা যায়।

ঘষা দাগ

চতুর্থপরিচ্ছেদ
গত পরিচ্ছেদে আমরা খনিজের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছি যা খনিজ চেনার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। এখন আমরা আরও কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করব।

হাইড্রোক্লোরিক অম্লের সাথে বিক্রিয়া
খনিজের সঙ্গে হাইড্রোক্লোরিক অম্লের বিক্রিয়ার সাহায্যে কার্বনেট খনিজদের অন্য খনিজদের থেকে আলাদা করে চেনা যায় খুব মৃদু শক্তির হাইড্রোক্লোরিক অম্ল এইকাজে ব্যবহার করা হয়। পূর্ণ শক্তির অম্লের সাথে জল মিশিয়ে লঘু করা হয়। বাজার থেকে সংগৃহীত অম্লের সঠিক মাত্রা জানা থাকলে পরিমাণ মত জল মিশিয়ে উপযুক্ত শক্তি মাত্রার অম্ল দ্রবণ তৈরি করা যায়যেমন ১ N শক্তি মাত্রার অম্লকে ০.N মাত্রায় প্রস্তুত করার জন্য দশগুণ পরিমাণ জল মেশাতে হবে। অম্লদ্রবণ তৈরি করার সময় জলের সাথে অম্ল মেশানো উচিত যাতে পূর্ণশক্তির অম্ল ছলকে না পরে।
খাঁজ বা ক্লিভেজ
যদি কোনও খনিজ ভাঙ্গার সময় সর্বদা একটি নির্দিষ্ট তল তৈরি করে তাহলে সেই খনিজ খাঁজ বা ক্লিভেজ বৈশিষ্ট্যযুক্ত। একটি খনিজের একাধিক ক্লিভেজ থাকতে পারে আবার একটা ও না থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ
·                     অভ্র জাতীয় খনিজ (মাস্কোভাইট, বায়োটাইটই ত্যাদি) সবসময় একটি নির্দিষ্ট ক্লিভেজতল তৈরি করেআবার ফেলসপার জাতীয় খনিজ ভাঙ্গার সময় দুটি নির্দিষ্ট ক্লিভেজ তল তৈরি করে যা প্রায় সমকোণে অবস্থিত।
অভ্র
·                     কোয়ার্টজ খনিজের কোনও ক্লিভেজ নেই।এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফেলসপার এবং কোয়ার্টজ এই দুটি খনিজ কে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। কোয়ার্টজ এবং চার্ট এই দুটি খনিজ ভাঙ্গার সময় একটি বিশেষ অবতল ভঙ্গীতে ভাঙ্গে অনেকটা ভাঙ্গা শামুকের খোলার মত। এটা যদিও ক্লিভেজ নয় তবু এটা খনিজের একটি বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা খনিজ চেনার সহায়ক।

কিছু খনিজের তিনটি তলে ক্লিভেজ তৈরি হয় যেমন ক্যালসাইট।

খনিজের আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য
খনিজের গলন বলতে আমরা বুঝি যে খনিজের একটা ছোট টুকরোকে গলিয়ে বড়ি বা গ্লোবিউল বানাতে কতটা তাপ প্রয়োজন। বেশ কিছু খনিজ মোমবাতি কিম্বা সিগারেট লাইটার এর শিখাতে ধরলেই গ্লোবিউল তৈরি হয় বা খনিজের কিনারা গুলো গোলাকৃতি হয়েওঠে। খনিজ চেনার জন্য সহজেই এই পরীক্ষা করা যায় যেসব খনিজ এই তাপমাত্রায় গ্লোবিউল তৈরি করে তাদের গলন-মাত্রাবা ” – যদিও এই মান অর্থাৎ  গ্লোবিউল তৈরি করতে অসুবিধার মাত্রা কতটা অনুভূত সেটা আমাদের বিচার্য নয় আমরা শুধু জানতে উৎসুক যে খনিজটি গ্লোবিউল বানাতে সক্ষম না অক্ষমগলনের আরও কিছু পরীক্ষা বাড়ীতে কিম্বা পরীক্ষাগারে ব্লো-টর্চের সাহায্যে করা যেতে পারে কিছুদিন অনুশীলন করলে অনেকেই এতে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারেন

ঘনত্ব এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব
খনিজের ঘনত্ব এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব সহজেই নির্ণয় করার মত বৈশিষ্ট্য নয়। এর জন্য বিশেষ ধরনের যন্ত্রপাতি দরকার তবে আপেক্ষিক গুরুত্ব বা ঘনত্ব যে খনিজের যত বেশী সেটা তত ভারী   যেমন এক ইঞ্চি মাপের একটি গ্যালেনা খনিজের (সীসা বা লেড এর আকরিক) ঘনক সমানমাপের একটি পাইরাইট খনিজের তুলনায় অনেক বেশি ভারী সেরকম ব্যারাইট খনিজের মত একই ধরনের দেখতে অন্যান্য খনিজের তুলনায় ব্যারাইট বেশী ভারী সেরকমই ভারী সেরুসাইট এবং অ্যাংলেসাইট খনিজ দুটো সুতরাং বিভিন্ন খনিজ হাতে নিয়ে ভার অনুভব করে খনিজ চেনার ব্যাপারে একটা ধারণা করা যেতে পারে কিছুটা অনুশীলন করলে একজন খনিজ সংগ্রাহক বিভিন্ন খনিজের ওজনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ দ্বারা খনিজ সনাক্ত করণে পারদর্শিতা অর্জন করতে পারেন
বাড়ীতে কিম্বা পরীক্ষাগারে খনিজ সনাক্ত করণে আপেক্ষিক গুরুত্ব(আঃগুঃ) একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় ধর্ম একজন খনিজ সংগ্রাহক আঃগুঃ সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান অর্জন করে নিলে অনেক অচেনা খনিজের আঃগুঃ নির্ণয় করে সনাক্ত করতে পারবেন অনেক বইতে কি্ম্বা ল্যাবরেটরি ম্যানুয়ালে এই পরীক্ষাবিধি দেওয়া আছে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীদের থেকে  ব্যালেন্স সংগ্রহ করে কিম্বা স্থানীয় বিদ্যালয়ের রসায়নাগারে পরীক্ষা দ্বারা সহজেই আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ণয় সম্ভব

চুম্বকত্ব
খনিজে চুম্বকত্ব খুব বেশী দেখা যায়না যদিও কিছু খনিজের এই বৈশিষ্ট্য তাদের চেনার সহায়ক সংগ্রাহক একটি ছোট শক্তিশালী চুম্বক সাথে রাখলে যেসব খনিজের এই বিশেষত্ব আছে তাদের সহজেই আলাদা করে ফেলা যায় ম্যাগনেটাইট লোহার একটি আকরিক এবং তার চুম্বকত্ব বেশ শক্তিশালী সংগ্রাহক অতি সহজে চুম্বকের সাহায্যে একে চিনে নিতে পারেন। আরও কিছু স্বল্প চুম্বকত্বের খনিজ হল পিরহোটাইট, ইলমেনাইট এবং ফ্র্যাংকলিনাইট
Picture attribute:
quartz  By JJ Harrison (jjharrison89@facebook.com) (Own work) [CC-BY-SA-2.5 (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/2.5)], via Wikimedia Commons
feldspar: By Eurico Zimbres (Own work) [CC-BY-SA-2.5 (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/2.5)], via Wikimedia Commons
gypsum: By Rama (Own work) [CC-BY-SA-2.0-fr (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/2.0/fr/deed.en)], via Wikimedia Commons
calcite: By Siim Sepp (Sandatlas) (Own work) [CC-BY-SA-3.0 (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/3.0)], via Wikimedia Commons
fluorite: Rob Lavinsky, iRocks.com – CC-BY-SA-3.0 [CC-BY-SA-3.0 (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/3.0)], via Wikimedia Commons
corundum: Rob Lavinsky, iRocks.com – CC-BY-SA-3.0 [CC-BY-SA-3.0 (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/3.0)], via Wikimedia Commons
diamond: By Eurico Zimbres FGEL/UERJ (Own work) [CC-BY-SA-2.0-br (http://creativecommons.org/licenses/by-sa/2.0/br/deed.en)], via Wikimedia Commons

By H at en.wikipedia [CC-BY-2.5 (http://creativecommons.org/licenses/by/2.5)], from Wikimedia Commons

No comments:

Post a Comment